Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

Monday, September 19, 2011

স্বপ্নের পাখি

                                  
প্রতিদিনই আবিরের মনটা খুব খারাপ থাকে।জীবনটাকে তার কেমন যেন একঘেয়ে মনে হয়। বন্দী পাখি খাচায় বসে যেমন ছট্ফট্ করে তার অবস্থা ঠিক তাই।মাঝে মাঝে তার কাছে নিজেকে যন্ত্রমানব মনে হয়।
প্রতিটা দিন প্রতিটা সময় তাকে নানা রকম ধরা বাধা নিয়মের মধ্যে চলতে হয়।এইতো সকাল ছয়টা না বাজতেই আম্মু এসে তার ঘুম ভেঙ্গে দিয়ে যায়। তারপর সে হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করে বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুলে চলে যায়। তার আব্বু তাকে স্কুলে দিয়ে আসে। তাকে স্কুলে দিয়ে এসে তার বাবা-মা চলে যায় নিজ নিজ অফিসে। আসার সময় বাড়ির চাকরটা তাকে স্কুলে থেকে নিয়ে আসে। তার আম্মু তাকে ফোনে বলে দেয় কখন কি করতে হবে। কখন খেতে হবে আবার কখন হোম ওয়ার্কগুলো করতে হবে ইত্যাদি। স্কুল থেকে এসে তারপর সে ঘরের ভিতর বন্দি। হয়ত টিভি দেখা নয়ত কম্পিউটারে গেমস খেলা ছাড়া তার আর কোন কাজ থাকে না। সারাক্ষণ টিভি দেখা কিংবা গেমস খেলতে কারই বা ভাল লাগে? আবির ঘরে একা বসে থেকে নানা কথা ভাবতে থাকে। সে একটু বাইরে ও যেতে পারে না। কারণ তার মায়ের মানা। মা বলে, বাইরে গেলে তুমি খারাপ হয়ে যাবে, বাইরে যায় যত্তসব বখাটে ছেলেরা। তাই বাইরে না যেতে মায়ের করা নির্দেশ। ঘরে সে কথা বলার মত একজন  মানুষ ও পায় না।
মাঝে মাঝে সে খাঁচায় বন্দি থাকা পাখিটার সাথে এক এক কথা বলতে থাকে। সে নানা কথা বললে ও পাখিটা তার কোন উত্তর দেয় না। শুধু তার দিকে চেয়ে ডাকতে থাকে। একদিন আবির বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাখির খাঁচাটার সামনে একা একা কথা বলছিল। সে তার দুঃখের কথা পাখিটাকে শুনাতে লাগল। এমন সময় সে শুনতে পেল কে যেন বলছে, আবির তুমি দুঃখ করো না, আমি তোমাকে এখান থেকে মুক্ত কওে দিতে পারি। আবির বুঝতে পারল না কে কথা বলছে। সে চারদিক তাকিয়ে আশেপাশে কাউকে দেখতে পেল না। সে ভাবতে লাগল, কে কথা বলছে? সেই কন্ঠটি আবার বলল; তুমি হয়ত ভাবছ তোমার আশেপাশে কেউ নেই অথচ কে কথা বলছে, তুমি খাঁচার পাখিটির দিকে তাকাও তাহলে বুঝতে পারবে আমি কে কথা বলছি। আবির খাঁচায় তাকিয়ে তো অবাক! তার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না যে পাখিটি কথা বলছে! সে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, সত্যি তুমি কথা বলতে পার আমার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। তখন পাখিটি বলল, বিশ্বাস না হওয়ারই কথা, কারণ আমরা কোন দিন মানুষের সাথে কথা বলি না। আমরা তোমাদের মনের কথা ও বুঝতে পারি। আমি জানি তোমার দুঃখ আর আমার দুঃখ এক। আমিও তোমার মত খাঁচায় বন্দি। ইচ্ছা করলে ঘুরে বেড়াতে পারি না। তোমাকে আমার একটা কথা রাখতে হবে, আমি যে কথা বলতে পারি এটা তুমি কাউকে বলবে না। আবির পাখিটির কথায় রাজি হয়ে যায়। তার কাছে নিজেকে খুব অপরাধী মনে হলো। কারণ সে-ই পাখিটিকে খাচায় বন্দি করে রেখেছে। সে আস্তে করে খাঁচার মুখটি খুলে দেয়। আর তখন পাখিটি খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে যায়। আবিরের পাখিটির প্রথম কথাটি মনে পড়ে। সে বলে আমি তো তোমাকে মুক্ত করে দিয়েছি বন্দি খাঁচা থেকে, এখন বল তুমি কিভাবে আমাকে এই বন্দি জীবন থেকে মুক্ত করবে। তখন পাখিটি বলল, হ্যাঁ আমি তোমাকে বন্দি জীবন থেকে মুক্ত করব। আমি তোমাকে খোলা আকাশ, বন-জঙ্গল সব ঘুরিয়ে আনব। তার জন্য তোমাকে অনেক দিন বাবা-মা থেকে আলাদা থাকতে হবে। তুমি থাকবে দূর বহু দূরে। পৃথিবীর সব দেশ তুমি ঘুরবে। আবিরের প্রথমত পাখিটির কথা বিশ্বাস হয় না। পৃথিবী দেখার সখ তার অনেক দিনের তাই সে পাখিটির কথায় রাজি হয়ে যায়।
পাখিটি খোলা আকাশে এসে তার ডানাগুলো মেলে দেয়। আর তখন সে অদ্ভুদভাবে বড় হতে থাকে। আবির পাখিটির ডানায় চড়ে বসে। পাখিটি তাকে নিয়ে খোলা আকাশে উড়তে থাকে। আবির পাখিটিকে জিজ্ঞাসা করে, আচ্ছা তুমি এত বড় হলে কিভাবে? পাখিটি কিছ্্ুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আমার বাড়ি দক্ষিন আমেরিকায়। কোন দেশ এখন আর মনে নেই। আমরা ছিলাম অনেক বড় জাতের পাখি। নিজের নামটা ও ভুলে গেছি অনেক দিন বন্দি থেকে। একবার শীতের সময় আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলাম। আমি তখন সদ্য উড়তে পারা একটি পাখি। বাংলাদেশে আসতে আমাদেও বহু বিপদেও সম্মুখীনহতে হয়েছিল। মা বলেছিল, বাংলাদেশ নাকি খুব সুন্দর একটা দেশ তবে এর মানুষগুলো নাকি খুব খারাপ। তারা নাকি অতিথি পাখিদের মেরে ফেলে তাই তিনি আমাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস শেষ পর্যন্ত আমাকেই ওদের হাতে ধরা পড়তে হয়েছিল। আমাদের একটা নিয়ম ছিল মানুষের হাতে ধরা পড়লেই আমরা ছোট হয়ে যাই। শিকারীরা আমাকে হঠাৎ ছোট হতে দেখে তারা খুব অভাক হয়েছিল। আমাকে নিয়ে তারা নানা রকম গবেষণা করল কিন্তু শেষে তথ্যে কিছুই পাওয়া গেল না। আর তখন তোমার আব্বু আমাকে অনেক টাকা দিয়ে কিনে বাড়ি নিয়ে যায়। তখন থেকে আমি তোমার দুঃখগুলো উপলব্ধি করতে লাগলাম। বুঝলাম আমার মতো তোমার ও একই কষ্ট। আর তুমি আমাকে মুক্ত করে দেওয়ায় আবার আমি আগের মত হয়ে গেছি। পাখিটি কথাগুলো বলার সময় তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। আবির ও পাখিটির কষ্ট বুঝতে পারল। সে (পাখিটি) আজ প্রায় তিন বছর তার মা-বাবাকে দেখতে পারেনি। সে ছিল তাদেও থেকে অনেক দূরে।
মুহূর্তের মধ্যে পাখিটি তার আগের সব কষ্ট ভূলে গেল। সে নতুন মুক্ত স্বাধীন জীবনকে উপভোগ করতে লাগল। আবিরের আনন্দ যেন আর ধরে না। সে কখনো নদী দেখিনি। শুধু বইয়ের পাতায় নানা বর্ণনার কথা সে শুনেছে। আজ সে নিজের চোখে নদী দেখছে, নৌকা, গাছ-বন দেখছে সত্যিই তার কাছে ব্যাপারটা অন্যরকম লাগছে। বহু সাগর নদী পেরিয়ে তারা চলে এল আমাজান বনে। এ সময় তার (পাখিটির) সাথে দেখা হলো তার পুরনো বন্ধুদের। তারা প্রথমে তাকে চিনতে পারল না। পরে যখন সব ঘটনা শুনল তখন তারা সবাই আনন্দে কেঁদে দেয়। তাদের কাছে সে তার বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, তোমাকে হারিয়ে তারা আর এই দেশে ফিরে আসেনি। আমরা ঠিকই চলে এসেছি। কিন্তু এখনো তারা তোমার অপেক্ষায় বসে আছে। তাদেও কথা শুনে পাখিটি খুব ব্যাকুল হয়ে যায়। সে পুনরায় বাংলাদেশের দিকে ফিরে আসতে লাগল।
এদিকে আবিরকে না পেয়ে তার বাবা হুলস্থ’ূল কান্ড করে বসিয়েছে। তারা পুলিশ, পত্রিকা ,টেলিভিশন সব জায়গায় খবর দিয়ে একাকার করেছে। খুব আদরের সন্তান তাই তাকে না পেয়ে তার বাবা-মার উম্মাদ হওয়ার অবস্থা!
আবির বাইরের পৃথিবী যতই দেখে ততই মুগ্ধ হয়।সে পাখিটা তাকে পৃথিবীর সব দেশ ঘুরিয়েছে। পৃথিবীর সব ভাস্কর্য সে মুগ্ধ হয়ে দেখেছে। সে কখনো ভাবেনি পৃথিবী এত সুন্দর! সে যত দেখে তত মুগ্ধ হয়। আবির নিজেকে সবচে সুখী মানুষ ভাবতে লাগল।
দেখতে দেখতে তারা আবার চলে এল বাংলাদেশে। সেই পাখিটার সাথে তার বাবা-মার দেখা হয়।তারা তাকে দেখে আনন্দে কেঁদে দেয়। অতি আদরে পাখিটাকে তার মা বুকে তোলে নেয়। মায়ের এ ভালবাসা দেখে আবিরেরও তার মায়ের কথা মনে পড়ে।মায়ের মুখটা তার চোখে ভাসতে থাকে।সে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য কান্না করতে থাকে।মা পাখিটা আবিরের কথা জানতে চায়। বাচ্চা পাখিটা আবিরের সব কথা খুলে বলে।আবিরের জন্য মা পাখিটা খুব দুঃখ করে।তবুও তাকে তার মায়ের কাছে দিয়ে আসার জন্য বলে।সে বলে, যত দুঃখ কষ্ট হোক কোন বাচ্চা তার মায়ের সান্নিধ্য ছাড়া থাকতে পারে না।
 বাচ্চা পাখিটা আবিরকে তার বাসায় দিয়ে যায়।পাখিটাকে বিদায় জানাতে আবিরের খুব কষ্ট হয়। তার চোখ দিয়ে হঠাৎ টুপটুপ করে পানি পড়তে থাকে।
                           *****************************
আবিরকে ফিরে পেয়ে তার বাবা-মা যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। তারা মা তাকে আনন্দে কোলে তোলে নেয়। তখন আবিরের সেই পাখিটার কথা মনে পড়ে।সত্যিই তো, মা ছাড়া কে-ই বা থাকতে পারে। তবে তার বাবা গোয়েন্দার মতো নানা প্রশ্ন করতে থাকে। আবির পাখিটার কথা কিছুই বলে না।সে কোন রকমে কথা কাটিয়ে যায়।
সেদিন থেকে আবিরের মা-বাবা তার কষ্টগুলো বুঝতে পারে। আবিরের আম্মু তার চাকরিটা ছেড়ে দেয়। স্কুলের পর তিনি আবিরকে নিয়ে গল্পের বই কিনতে যায়, নানা জায়গায় ঘুরিয়ে আনে। রাতে পড়া শেষ হলে তাকে নিয়ে বসে বসে গল্প শোনায়।তখন থেকে আবিরের সব শূন্যতা কেটে যায়। তার দিনগুলো কাটে বেশ আনন্দের সাথে। জীবনটাকে তার কাছে আর যান্ত্রিক মনে হয় না। সপ্তাহে একবার তার বাবা তাকে নিয়ে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে বেরিয়ে আসে।আবির মনে মনে সেই পাখিটাকে কৃতজ্ঞতা জানায়।
খাঁচার শূন্যতা এতদিন তার বাবা-মার চোখে পড়েনি। কারণ খাঁচাটা তার রুমে থাকায় কেউ অতটা খেয়াল করেনি।  কিন্তু সেদিন বিষয়টা তার মায়ের চোখে আটকে যায়। সে জিজ্ঞাসা করে, পাখিটা কোথায়? আবির নিঃসঙ্কোচে সে দিনের কথা সব খুলে বলে। কিন্তু তার আম্মু কিছুই বিশ্বাস করে না। তবে ওর সামনে ওরটাই বিশ্বাস করেছে এমন ভাব দেখাল। তার আম্মু হয়তো ভেবেছে, পাখিটাকে ছেঁড়ে দিয়ে সে মিথ্যে গল্পের ফাঁদ পেতেছে। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করতে পারল না যে, সে দিনের ঘটনাটা ছিল সত্যি! তবে সে দিনের ঘটনাগুলো আবিরের কাছেও কেমন যেন রূপকথার মতো মনে হয়।
মাঝে মাঝে স্বপ্নেও পাখিটা আবিরের সাথে দেখা করে যায়। তাই আবির পাখিটার নাম দেয় ‘স্বপ্নের পাখি’। সে এখনো মাঝে মাঝে স্বপ্নে পাখিটার সাথে ঘুরে বেড়ায়!

সুমনের ভূতপ্রীতি

   একদিন আমি আর সুমন বল খেলে বাড়ি ফিরছিলাম। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা। দু’জনের মধ্যেই আজ ভয়, বাড়ি গেলে মার খেতে হবে।কিভাবে মার খাওয়া থেকে বাঁচা যায় সে বিষয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা করতে লাগলাম। কিন্তু কোন উপায়ই খুঁজে পেলাম না।
    দু’জনে রাস্তা দিয়ে হাটছি পায়ের আওয়াজগুলোও ভূতোরে মনে হচ্ছে! গাছের শুকনো পাতার মর্মর আওয়াজটাও  যেন ভয় পাইয়ে দিচ্ছে! ক্রমে চারদিকে নিকশ কালো অন্ধকার হয়ে এলো। আমার বুক দুরু দুরু করতে লাগল। আমি এমনিতেই ভীতু, তার উপরে এমন পরিবেশ! তাই সুমনের হাত ধরে ভয়ে কাপছি!
   আমার মতো সুমন কিন্তু অতো ভয় পেতো না।ওর ভূতে বিশ্বাস নেই।ভূতের কথা বললে সে বলে, ‘যে দিন ভূত এনে সামনে দেখাতে পারবি, সেদিনই বিশ্বাস করব।আসলে ভূত-টূত বলে কিছু নেই!’ ওকে কতবার ভূতের গল্প শুনিয়ে ভয় দেখাবার চেষ্টা করেছি,কিন্তু সব চেষ্টা বৃথা হয়েছিল।
      আমরা যখন গগণ শেখের বাড়ির সীমানায় পৌঁছলাম ঠিক তখন ঝোপ থেকে একটা সাদা মূর্তি বেরিয়ে আসল। ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে গেল।প্যান্টটা ভিজে গেল কিনা বুঝলাম না! ‘ভূত, ভূত’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠলাম।
     ভূতটা আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ভয়ে আমি পিছিয়ে যেতে লাগলাম। ভূতের কথা শুনে সুমনের আগ্রহ আরো বেড়ে গেল!সে বলল, ‘ওহহো, জীবনে কখনো ভূত দেখিনি, আজ আমাকে ভূত কেমন দেখতেই হবে!’ এ কথা বলে সে ভূতের দিকে এগিয়ে গেল! আমি তাকে বার বার নিষেধ করলাম, যাসনে, ভূত তোর ঘাড় মটকাবে।কে শোনে কার কথা!সে এগিয়ে গেল ভূত দেখতে।
      তাকে এভাবে হঠাৎ করে এগিয়ে যেতে দেখে ভূত বাবাজিও হয়ত ভয় পেয়েছে। তাই বার বার বলতে লাগল, হাঁউ মাঁউ খাঁউ মাঁনুঁষেঁরঁ গঁন্ধঁ পাঁও।যাঁরে পাঁবোঁ কাঁছেঁ ঘাঁড় মঁটঁকেঁ নেঁবঁ গাঁছেঁ। সুমন ভূতের কাছে গিয়ে বিনয়ের সঙ্গে বলল,‘ভূত ভাই আমি কখনো ভূত দেখিনি, আপনি যদি দয়া করে একটু আপনার চেহারাটা ভালো করে দেখাতেন তাহলে হয়ত আমার চিরদিনের আশা পূরণ হতো।’
    তখন ভূত বলল, হেঁহ্ঁহেঁ আঁমাঁরঁ কোঁনঁ চেঁহাঁরাঁ নেঁই, শঁরীঁরঁ নেঁই।আঁমি থাঁকি বাঁতাঁসে, হিঁহঁহি।
     সুমন ছিল নাছোড়বান্দা সে যা বলে তাই করে ছাড়ে। আমিও তা টের পেয়ে গেলাম! কিন্তু তবুও ভয়ে শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছিল!
   সুমন ভূতের চেহারা দেখার জন্য জোরাজুরি করতে লাগল।আমি ভাবলাম ভূতের হাতে বুঝি ওর প্রাণটাই যায়! ঠিক তখন ভূতের ভয়ার্ত কন্ঠে শুনলাম, সাঁবঁধাঁন! গাঁয়েঁ হাতঁ দিঁবিঁ নাঁ। সেও কম কিসে! ভূতের কাপড় ধরে টানাটানি শুরু করে দিল।
      ওর এভাবে টানাটান দেখে আমারও ভয় কেটে গেল। আমিও ওর সঙ্গে যোগ দিলাম।ভূতের চেহারা দেখার ইচ্ছা আমারও হলো।দু’জনের টানাটানিতে ভূতের পড়নে থাকা উপরের সাদা কাপড়টা খুলে গেল।
     একি! এ তো আমাদের ক্লাসের  ভল্টু। ওর পরিচয় প্রকাশ পাওয়াতে বেচারা কাঁদতে লাগল।আমাদেও ভয় দেখাতে এসে বেটা নিজেই নাকানি-চুবানি খেয়ে গেল।দু’জনে মিলে আচ্ছামত ধোলাই দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। সেদিন থেকে ভূতের প্রতি আমিও বিশ্বাস হারালাম। ভয় পেলেই মনে হতো , ভূত বলতে কিছুই নেই।এসব  হচ্ছে মনের ভীতি। সুমনের ভূতের প্রতি এত কৌতূহল থাকাতেই তো ভূতটাকে ধরতে পেরেছিলাম।

Friday, September 16, 2011

প্রেম নিবারণ কমিটি

এলাকার ভিতরে মুহিদ ভাই বেশ সাংগঠনিক লোক হিসেবে পরিচিত। যে কোন মুহূর্তে যে কোন সংগঠন দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারেন। তাই ওনার সাথে আমাদের সখ্যতাটা ও বেশ। কারন ওনার সংগঠনের প্রথম সারির সদস্য হিসেবে তো আমরাই থাকি। নতুন কোন সংগঠন চালু করলেই প্রথমে ডাক পড়ে আমাদের।
মুহিদ ভাই এ পর্যন্ত দশের উপর সংগঠন তৈরি করেছিলেন। কিন্তু একটাও বেশিদিন টিকেনি। ‘চোর ধরা কমিটি’ তৈরি করে তো একবার পুরো গণ-ধোলাই খেতে হয়েছিল। তারপর ও ওনার সংগঠন প্রীতি কমেনি।
সেদিন তিনি বালুকে দিয়ে আমায় খবর পাঠালেন নতুন সংগঠনের কথা বলে। কি আর করব এলাকার বড় ভাই বলে কথা, যেতে তো হবেই।
নতুন সংগঠনটা বেশ জোরালো ভাবেই শুরু করেছেন বলে মনে হলো। সংগঠনের প্রথম সভায় আমার মতো এলাকার অনেক ছেলেই যোগ দিয়েছে। নতুন সংগঠনের কাজ কি এখনো তা কারো কাছে খোলাস নয়। সভায় এসেই মুহিদ ভাই শুরু করল, “বুঝলিরে বাবলু, ইদানিং ছেলেদের ভিতর ভাইরাসের মত যেভাবে প্রেম সংক্রমন হচ্ছে এলাকার অবস্থা খারাপ হতে আর বেশি দিন নেই। ছেলে পেলে সব পড়ালেখা বাদ দিয়ে প্রেম-পত্র লেখায় ব্যস্ত। আর বাপের পকেট চুরি তো অহরহ ঘটছেই। মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় এ প্রেমের কারণেই ঘটছে। তা বন্ধ করা না গেলে ছেলেগুলো সব বখে যাবে।”
মুহিদ ভাইয়ের কথা শুনে দেখলাম নুজুর মুখটা বেশ শুকিয়ে গেছে। বেচারা সদ্য মন আদান প্রদানে ব্যস্ত। গোগলটাকে ও দেখলাম বেশ চুপসে যেতে।
তারপর তিনি আবার শুরু করলেন, “তোরা তো এলাকার কোন খবর রাখিস না। তাহলে বুঝতি প্রেমের ভাইরাস ছেলেদের কিভাবে সংক্রমন করছে। মাঝির বার বছরের ছেলেটা ওপাড়ার সখিনাকে নিয়ে পালিয়ে, ব্যাপারটা ভাবতে পারিস তোরা। তাছাড়া ইদানিং বাবলুর ছোট ভাইটাকে ও মেয়েদের পেছনে ঘুর ঘুর করতে দেখা যায়।”
এ কথা শুনে আমার বেশ রাগ চেপে গেল। তাই দাঁড়িয়ে বললাম, “এ কী বলছেন মুহিদ ভাই। যে আমি জীবনে কখনো মেয়েদের দিকে তাকাইনি। আর আমার ভাই!! না, বিশ্বাস হয় না।”
এবার মুহিদ ভাই বেশ মুড নিয়ে বললেন, “বিশ্বাস হবে কেমন করে, আমার ও তো প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। আর এ কারণেই তো আজ তোদের ডাকলাম। আমরা একটা নতুন কমিটি গঠন করব যার নাম হবে ‘প্রেম নিবারণ কমিটি’ এ কমিটির কাজ হবে এলাকার ছেলেদের মন থেকে প্রেমের ভাইরাস দূর করা। আর যত প্রেম কাহিনী চলছে সবগুলোর সমাপ্তি টানা “
সবাই মিলে ভেবে দেখলাম ব্যাপারটা আসলে খারপ না। বেশ জনকল্যানমূলক কাজ হবে। তাছাড়া এলাকার ভাল ছেলেদের তালিকায় আসার এটা একটা বড় সুযোগ। ব্যাপারটা নিয়ে তাই আমরা সবাই বেশ উৎসাহী হয়ে পড়লাম। আর এরই মধ্যে আমরা পুরোদমে কাজও শুরু করে দিলাম। মুহিদ ভাইয়ের কথামতো, আমরা সবাই মিলে প্রেম বিরোধী স্লোগান দিয়ে বেশ কিছু প্ল্যাকার্ড, পোষ্টার তৈরি করলাম। তাতে লেখা ছিল প্রেমকে ঘৃনা কর প্রেমিককে নয়,প্রেম করার ছেয়ে মুরগি পালা ভাল। আর প্ল্যাকার্ড, পোষ্টার নিচে বেশ বড় করে লেখা ছিল প্রচারে ‘প্রেম নিবারণ কমিটি’।
আমাদের তৈরি এই প্ল্যাকার্ড আর পোষ্টারগুলো বেশ কাজে লাগল। কিছু কিছু ছেলে মেয়ে এই পোষ্টারগুলো দেখেই লজ্জায় প্রেম করা ছেড়ে দিল। তাছাড়া এলাকার মুরুব্বিরা এই প্রেম বিরোধী সংগঠনের বেশ প্রসংশা করতে লাগলেন।
বেশ কিছুদিনের ভিতর এই প্রেম নিবারন কমিটির জয় জয়কার পড়ে গেল। আর মুহিদ ভাই তো ভাবে একেবারে ভাবুক। কেউ সংগঠনের প্রসংশা করলে তিনি মুগ্ধ হয়ে তা শ্রবন করেন তারপর সংগঠনের সুদূর প্রসারী কিছু কাজের কথা শুনিয়ে দেন। যা শুনে লোকে বাহ্্! বাহ্! করে।
পাড়ায় কুখ্যাত প্রেমবাজ হিসেবে রকি খুবই সুপরিচিত। ওকে দিনের বেলায় গার্লস স্কুলের সামনে ছাড়া খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। সুন্দর কোন মেয়ে দেখলেই তার পিছে ঘুর ঘুর করে। ও যে এখন পর্যন্ত কত মেয়ের সাথে প্রেম করেছে তার সঠিক হিসাব ওর নিজের কাছে ও অজ্ঞাত। ওর মত কুখ্যাত প্রেমিককে কি করে ঠিক করা যায় সেটাই আমাদের প্রেম নিবারণ কমিটির পরবর্তী মিশন। ওকে যে এ থেকে দূরে রাখা সোজা নয় সেটা আমাদের সবারই জানা ছিল কিন্তু অসাধ্যকে সাধন করাই তো মানবের কাজ। তাই আমরা চেষ্টা চালিয়ে গেলাম।
সেদিন দুপুরে রকির সাথে আমার হঠাৎ দেখা। একটা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আমার দিকেই আসল। তারপর সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষতে পিষতে আমায় বলল, “শুনলাম তোরা নাকি প্রেম বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিস। ওসব না করে, বাসায় গিয়ে পিটার খা সেটা আরো ভাল হবে।” কথাটা শুনে আমার বেশ রাগ হল। কিন্তু তবু ও নিজেকে শান্ত রেখে ওকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম। প্রেমের অপকারিতা নিয়ে দীর্ঘ একটা বক্তব্য ও দিয়ে দিলাম। কিন্তু সবই মনে হয় বৃথা হল। সে আমায় থামিয়ে দিয়ে বলল, “তোর মত চ্যাচকা প্রেমের কি বুঝিস রে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ,জীবনানন্দ, কাজী নজরুল ইসলাম সবই তো প্রেমের গীত গেয়েছেন। শেক্সসপীয়ারের মত মানুষ লিখেছেন রোমিও জুলিয়েট। আহ্! প্রেম কি মধুর সেটা বুঝার বয়স কি তোদের হয়েছে। যত্তসব বুজরুকির দল।” তারপর যেই প্রেম স্বর্গ হতে এসে, জীবনে অমর হয়ে রয় এই গানটা গাইতে গাইতে চলে গেল।
রকির অপমানটা আমার বেশ গায়ে লেগে রইল। তবে কবি সাহিত্যিকদের উপর বেশ রাগ হল। সবাই তো প্রেম নিয়ে ইচ্ছামত কবিতা গল্প লিখেছেন। কিন্তু প্রেম বিরোধী একটা কবিতা ও খঁজে পাওয়া যায় না, যা ছেলেদের শুনানো যেত। তাই নিজেই প্রেম বিরোধী কবিতা লেখা শুরু করলাম। আর সেগুলো রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের নামে চালিয়ে সবাইকে পড়ে শুনাতে লাগলাম। রকির প্রেম নিবারন করার ভাল একটা আইডিয়া ও পেয়ে গেলাম মুহিদ ভাইয়ের কাছে। মুহিদ ভাই মানুষটা যে জিনিয়াস বুঝাই যায়।
পরিকল্পনা মত প্রথমে রকির বর্তমান প্রেমিকাকে খঁজে বের করা হল। তারপর তার কাছে ইচ্ছামত রকি সর্ম্পকে প্যাচ লাগানো হল। ফলে দেখা গেল দু দিনের ভিতর রকি চ্যাকা খেল। ছেলেটা দমবার পাত্র নয়, কিছু দিনের ভিতর নতুন একটা জুটিয়ে ফেলল। আমরা ও আশা দমবার নই, আগের পরিকল্পনাটাকেই কাজে লাগালাম। শেষ পর্যন্ত আমরাই সফল হলাম। বার বার চ্যাকা খেয়ে রকি প্রেমের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ল। সেদিন আমাদের সভায় যে নিজেই এসে হাজির হল। প্রেম নিবারন কমিটিতে নিজের নাম লিখিয়ে বলল, “বুঝলি বাবলু প্রেম-টেম ওসব ভুয়া। জীবনে কোন কাজে লাগে না। এসব থেকে যত দূরে থাকা যায় তত ভাল।” রকির মত প্রেমবাজ ছেলেকে যেহেতু আমরা ঠিক করতে পেরেছি সুতরাং বলা যায় আমরা সফল। এমন একটা সফল সংগঠন করতে পেরে আমরা সবাইতো খুশিতে আটখানা। আমাদের সফলতায় পাড়ায় আর স্কুলে সবার মুখে মুখে আমাদের নাম। সবাই অন্য রকম দৃষ্টিতে আমাদের দেখতে লাগল।
আমরা যখন প্রেম নিবারন কমিটি নিয়ে ব্যস্ত আছি, মুহিদ ভাইকে দেখলাম কেমন জানি অন্যমনস্ক। সংগঠনকে তেমন একটা সময় দিতে চান না। সংগঠনের ব্যাপারে তাকে বেশ নিরুৎসাহিত দেখা গেল। ইদানিং তার খোঁজ পাওয়া ও কঠিন, কোথায় কোথায় যেন যান। তাছাড়া এখন নাকি কবিতা লেখাও শুরু করেছেন। ওনার ব্যাপার স্যাপার কারো বোধগম্য হল না।
সেদিন কলেজ মাঠে বেড়াতে গিয়ে ব্যাপারটা আমাদের কাছে খোলাসা হয়ে গেল। কলেজের পুকুর ঘাটে বসে ওনাকে এক মেয়ের সাথে আলাপ করতে দেখলাম। ওনি যে ইদানিং প্রেমে পড়েছেন সেটা আর আমাদের বুঝতে বাকি রইল না। কিন্তু আমরাই প্রেম বিরোধী আন্দোলন করে আমরাই যদি... ... ... । ব্যাপারটা আমি আর ভাবতে পারছি না। সামনে যে মহাবিপদ আছে সেটা অন্তত টের পাচ্ছি। ভয়াবহ ব্যাপার থেকে বাচতে হলে কয়েকদিন গা ঢাকা না দিলেই নয়!


যারা ‘সুড়ঙ্গ বন্দী ‘ উপন্যাসটি পড়েননি তারা  ক্লিক করুন। পুরোটা একসাথে পাবেন।

অবুঝ

এক.
    
     দু’দিন ধরে রনির বানরটা বেশ দৌরাত্ত শুরু করেছে! সকাল-বিকাল তাকে ঘরে খুঁজেই পাওয়া যায় না। সারাদিন শুধু এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। আর লোকদের জিনিস চুরি করে এনে আপন খেলায় মাতে। কারও গাছে ফল দেখলে তার যেন আর সয্য হয় না। ফল খাওয়ার লোভে সারাক্ষণ সে গাছের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। সুয়োগ পেলেই গাছে চড়ে বসে। কাচা-পাকা সামনে যা পায় সব ফল পেড়ে কিছু এদিক-ওদিক ছুঁড়ে মাড়ে আর কিছু বাড়ি এনে মজা করে খায়। তার জন্য রনিদের অনেক গাল-মন্দ শুনতে হয়।
    রনি বাড়িতে না থাকলে বানরটা এ সুয়োগ পেয়ে যায়। তাকে ভয় না পেলে ও ভক্তি করে। তার কথার কখনো অবাধ্য হয় না। রনি বাড়িতে থাকলে বানরটা তার পিছনে অনুগত ভৃত্যের মত ঘুরে বেড়ায়। রনি যে কাজ করতে বলে যতটুকু করার সাধ্য চেষ্টা করে।
       বানরটা মাঝে মাঝে অন্যের গাছের ফল চুরি করে রনির টেবিলে এনে রেখে দেয়। রনি এসে দেখলেই বুঝে এটা কার কান্ড। সে বানরটাকে কড়া কথা বললে ওটা যেন আরো বেশি মজা পায়। আনন্দে গদ গদ করে তার কাঁধে গিয়ে বসে। সে যদি বানরটার গালে দুটো থাপ্পরও দেয় সে মনে করে তাকে যেন ধরে আদর করা হচ্ছে। তাই রনি মাঝে মাঝে এসব নিয়ে বানরটার উপর খুবই ক্ষেপে যায়। বানরটাকে সে বেশি ভালবাসে বলে তার রাগ মুহূর্তেই দমে যায়।
    মাঝে মাঝে বানরটা অদ্ভূত সব কান্ড ঘটিয়ে বসে। এইতো সেদিন বানরটা রনির প্যান্ট, শার্ট আর তার দাদুর মোটা প্রেমের চশমাটা পড়ে এমন ঢং সেজেছিল ওকে সেদিন যে-ই দেখেছে না হেসে পারেনি। দেখে যেন মনে হয়েছে ছোট    কোন ছেলে হয়ত বানরের অভিনয় করছে। ওর দাদু তার চশমা চুরি করাতে বানরটার উপর ভীষন ক্ষেপে গিয়েছিল। লাঠি দিয়ে মারার জন্য অনেকবার তেরে ও গিয়েছিল। কিন্তু বানরটা এমনি পাজি যে তার দাদুর লাঠি নিয়ে দে ছুট। দাদু ও ছুটল বানরটার পিছনে। দুজনের মধ্যে দৌড় খেলার মতো প্রতিযোগিতা শুরু   হয়। বানরটা বুদ্ধি করে গাছে ওঠে পড়ে। তার দাদু ও কম কিসে! তিনি ও উঠতে গেলেন গাছে। গাছটা ছিল খুবই চিকন আর এর ডালগুলো ছিল খুব নরম। বানরটা স্বাচ্ছন্দে উঠতে পারলে ও, দাদু উঠতে গিয়ে পড়ল বিপাকে। হঠাৎ গাছের নরম ডালগুলো মড়াৎ করে ভেঙ্গে দাদু চিৎপটাং হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আর তখন বানরটা আনন্দে হাততালি দিতে থাকে। এদিকে দাদুর মাটিতে পড়ে কোমর যায় যায় অবস্থা! এরপর টানা তিন দিন দাদুকে একটানা শোয়ায় থাকতে হয়েছে। সেদিন থেকে বানরটা দাদুর দু’চোখের বালি হয়ে যায়।


দুই.
    রনি তার বানরটার দুষ্টুমি ব›ধ করতে তাকে স্কুলে নিয়ে যায়। স্কুলের সামনের গাছটায় তাকে বসিয়ে রনি ক্লাসে চলে যায়। স্কুলের অন্যান্য ছেলেরা বানরটাকে দেখলে তার পাশে এসে ভিড় জমায়। বানরটাও তাদের সাথে দুষ্টুমি করা শুরু করে দেয়। হয়ত কারও কলম নিয়ে বিড়ি খাওয়ার অভিনয় করে কিংবা কারো প্যান্ট ধরে ঝুলে থাকে। আর তা দেখে অন্যান্য ছেলেরা সশব্দে হেসে উঠে। কেউ কেউ আবার ফাজলামো করে চকলেটের খোসায় মাটি ভরে বানরটাকে খেতে দেয়। বানরটা চকলেট পাগল তাই দেওয়ার সাথে মুখে পুরে দেয়। আর যখন দেখে এ অবস্থা তখন থুথু করে সব ফেলে দেয়। আর যে এই কান্ড করেছে তাকে পিছু তাড়া করে।
       যদি তার হদিশ না পায় তখন টিচারদের কাছে গিয়ে নালিশ করে। কথা তো বলতে পারে না, তাই টিচারদের জামা ধরে টেনে নিয়ে আসে। আর যে ছেলে এ কান্ড করেছে তাকে দেখিয়ে দেয়। টিচাররাও অনেক দিন বানরটাকে দেখতে দেখতে তার কিছু কথা বুঝে গেছে। আর তখন তারা বানরটাকে দেখানোর জন্য হালকা পিটুনি লাগায়। এ দৃশ্য দেখে সে আনন্দে হাততালি দিতে থাকে।
    অনেক সময় সে রনির কথাও অমান্য করে। রনি তাকে গাছে উঠে বসে থাকতে বলে কিন্তু একদিন তার আদেশ অমান্য করে বানরটা ক্লাসে এসে বসে থাকে। সবার পিছনের বেঞ্চে এমন ভাব নিয়ে বসে ছিল যেন মনে হচ্ছে কি মনোযোগ দিয়েইনা পড়া শুনছে! কেউ তখন ও লক্ষ্য করেনি বানরটা যে ক্লাসে। ক্লাসে ঢুকলেও সে কোন হই-চই কিংবা ডাকাডাকি করল না। শান্ত ছেলের মত বসে থাকল আর চোখটা ব্লাকবোর্ডের দিকে। প্রথমে বিষয়টা মাষ্টার মশাইয়ের চোখেই ধরা পড়ল। মাষ্টারমশাই তাকানোতে অন্যান্য ছেলেরাও সেদিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। রনিও তখন ক্লাসে বসা ছিল। এ অবস্থা দেখে তার রাগ চরমে উঠে। কিন্তু সে মাষ্টার মশাইয়ের সামনে অতটা রাগ দেখাতে পারল না।
        বানরটাকে গাছে বসিয়ে দিয়ে আসার জন্য সে তাকে ধরতে গেল কিন্তু মাষ্টার মশাই মানা করলেন। তিনি বললেন, থাক না বসে, ও তো আর ক্লাসের কোন অসুবিধা করছে না। তিনি হঠাৎ কথা কাটিয়ে বললেন, বানরটা তোমাদের থেকে আরো ভাল, দেখ না কি মনোযোগ দিয়েই না কথা শুনছে! আর তোমরা তো কথা বলেই যাও ক্লাসে কোন মনোযোগই দিতে চাও না। কি! ঠিক বলিনি?
 এ সময় রনি উচ্চস্বরে বলে উঠে, জ্বি স্যার!
আর অন্য ছেলেরা তখন লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখে। মাষ্টার মশাই বানরটার প্রশংসা করাতে রনির বানরটার প্রতি ভালবাসা যেন আরো বেশি বেড়ে যায়।
    এত দিন কেউই জানত না যে বিদ্যুৎ স্যারের মাথায় টাক ছিল। কিন্তু সেদিন তার বানরটার কারণে এ কথা ফাঁস হয়ে যায়। স্যার তখন দাঁড়িয়ে ছিলেন স্কুলের সামনের কড়–ই গাছটার নিচে। আর বানরটা ছিল গাছে। হঠাৎ বানরটা কি না কি ভেবে স্যারের ঘাড়ে গিয়ে বসল। স্যার বানরটাকে ঘাড় থেকে ফেলে দিতে চাইলেন। কিন্তুু প্রথম চেষ্টায় ব্যর্থ হলেন। পরে বানরটা নিজেই সরে গেল। তবে যাওয়ার সময় স্যারের নকল চুলগুলো টান দিয়ে নিয়ে গাছে উঠে যায়। স্যার তো পরচুলা হারিয়ে সবার সামনে পুরো বেকুব বনে গেলেন! বানরটাকে অনেক কিছুর লোভ দেখিয়েও তা আর উদ্ধার করতে পারলেন না।
      আর সেদিন স্যারের এ বিষয়টা ছিল স্কুলের প্রধান আলোচ্য বিষয়। ছাত্ররা স্যারকে দেখলেই মুচকি হাসা শুরু করল। স্যার বানরটার উপর সেদিন এতই রেগে যান যে, বানরটাকে তিনি স্কুলে না আনার জন্য বারণ করে দেন।
    রনির বানরটার কারণে স্কুলের ছাত্ররা অনেকবার স্যারদের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল। এর জন্য অবশ্য অন্যরা বাঁচলেও রনির ঠিকই মার খেতে হতো। কারণ তার বানরটা টিচারদেও বেত চুরি করে নিয়ে যেত। ফলে স্যাররাও আর মারার সময় বেত পেতেন না। তারা ভেবেই নিত যে এটা ঐ বানরটার কাজ। এতে দোষ এসে পড়ত রনির উপর। আর তখন রনির ভোগ করতে হতো পুরু শাস্তিটুকু। বানর পালার কারণে তাকে নিয়ে স্কুলের ছেলেরা অনেক কথা বলত। স্কুলে সবাই তাকে ‘বানর পালা রনি ’ বলে ডাকত।


তিন.

       প্রায় তিন মাস হলো রনি এই বানরটাকে পালছে। অথচ তার একটা নামও এখনো দেয়া হয়নি। দেয়া হয়নি বললে ভুল হবে কারণ সে মনের মত একটা নাম এখনো খুঁজে পায়নি। একেক জন একেক নাম দিতে বলে কিন্তু কারোটাই তার তেমন পছন্দ হয়নি। তিনমাস চিন্তা করেও সে একটা ভাল নাম খুঁজে পায়নি। এ কথা শুনে অনেকেই হাসে। রনি অবশ্য কে কি বলে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না! সে শুধু নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, অন্যে কি বলে তা যেন শুনতে ও চায় না। শেষে অনেক চেষ্টা করে মাথা ঘামিয়ে রনি তার নাম ও তার প্রিয় খেলোয়ার রিকি-পন্টিয়ের নামের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে বানরটার নাম দেয় ‘ররি’। এ নাম শুনে অনেকেই তাকে টিট্কারি করে। রনি ওসব কানে ও তোলে না। সে বলে, আমার বানর আমি যা ইচ্ছা তাই নাম দেব তাতে তোদের কি? মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে বানরটা বুঝে গেল যে তার নাম ররি। ররি বলে ডাকলেই সে ছুটে আসে। তার নিজের একটা নাম থাকাতে বানরটাও যেন খুশিতে গদগদ!
    একদিন রনি স্কুল থেকে এসে দেখে টেবিলের উপর তার বই খাতাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। ঘরের কোনায় চোখ যেতেই তার চক্ষু চড়কগাছ। ররি (বানরটা) তার নতুন কেনা বইগুলোর উপর কলম দিয়ে কি যেন আঁকিবুকি করছে। তাকে দেখেও বানরটার মধ্যে কোন ভয়ের চিন্থ দেখা গেল না। তার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসির ভান করে ররি আবার নিজ কাজে মন দিল। রনি টান দিয়ে বানরটার কাছ থেকে তার বইগুলো কেড়ে নিল। আর বানরটাও তখন কিচ্ কিচ্ আওয়াজ শুরু করে দিল।
রনি জোরালো কন্ঠে বলল, চুপ কর। ওর কথা শোনার সাথে সাথে ররি চুপ হয়ে যায়। সে আস্তে করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রনি বইয়ের দিকে তাকিয়ে রাগে তার মুখটা রক্তশূন্য হয়ে যায়। ররি তার বইগুলো সব ছিঁড়ে, নানা রকম আঁকিবুকি করে একদম পড়ার অযোগ্য করে তুলেছে। রনি এ কথাটা তার বাবা-মাকে কিছুদিন জানাল না। কারণ তারা জানলে হয়ত বানরটাকে ঘর থেকে বের করে দিতে পারে! তবে সে দিন থেকে রনি বানরটা তথা ররিকে শিকল দিয়ে আটকে রাখত। কারণ কথাই আছে, ‘আদর দিয়ে পুষলে বানর মাথায় উইঠা নাচে।’


চার.
    এতক্ষণ তো ররি সম্পর্কে অনেক কথাই হলো। কিন্তু বানরটা রনির কাছে এলো কিভাবে তা এখন ও তোমাদের বলা হলো না। তাহলে শোন সেই গল্পÑ
    রনিদের গ্রামের নাম শালচর। গ্রামের নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের স্কুলের নাম করা হয়েছে।এটা অবশ্য সব জায়গায় করা হয়।মানুষও নামের অভাবে ভোগে! তাই একটা দিয়ে আরেকটার নাম রাখে! একবার রনিদের স্কুলের পক্ষ থেকে একটা বনভোজনের আয়োজন করা হলো। এতে ছাত্র-শিক্ষক প্রায় অনেকেই অংশগ্রহন করল। রনিও বাদ গেল না। সে ও যোগ দিল সবার সাথে। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম যাবে পিকনিক করতে। এত দূরে যাবে শুনে অনেক বাবা-মাই তাদের সন্তানদের যেতে দিল না। রনির বাবাও বাধ সাধল। কিন্তু সে ছিল নাছোর বান্দা। তার এক কথা সে বনভোজনে যাবে যাবেই। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ও তাকে আর দমানো গেল না। তার বাবা আর কি করবে, শেষ পর্যন্ত তাকে যেতে দিতে বাধ্য হলেন।
    তাদের বাসটা চলতে লাগল চট্টগ্রামের প্রানে। সবকিছু আগে থেকেই গুছিয়ে নেয়া হয়েছে। পিকনিকটা বেশ আনন্দের হবে বলে মনে হলো। বাসের মধ্যে গানের আয়োজন করা হলো। একে একে সবাই গান গাইল। রনিও বাদ গেল না। টিচাররা অনেকে গিটার বাজিয়ে গান গাইলেন।
    রনির কাছে আজকের দিনটা অন্য দিনের চেয়ে খুব ভাল লাগছে। সে জানালা দিয়ে তাকিয়ে বাইরের দৃশ্য অবলোকন করতে লাগল। মাঠ জুড়ে অবারিত হলুদ শর্ষেফুল তার চোখে ধাঁধাঁ ধরিয়ে দেয়। মনে হয় যেন, প্রকৃতি হলুদের চাদর বিছিয়ে রেখেছে। নদীর ধারে ফুটে আছে কত জানা আর কত অজানা ফুল। গাঙের সামান্য পানিতে সাদা বক কি যেন খুঁজে বেরোচ্ছে। মাঝে মাঝে রাস্তার দু’পাশে গাছ-পালার ঘন ঝোপ জঙ্গল চোখে পড়ছে। সবাই দৃশ্যগুলো বেশ আনন্দের সাথে দেখছে। তবে জানালার কাছে যারা বসেছে তাদের সুবিধা হলো বেশি। আর যারা তাদের পাশে বসেছে তাদের মন্দ ভাগ্যই বলতে হয়। কারণ তারা বাইরের প্রকৃতি কোন কিছুই ঠিক মত দেখতে পাচ্ছে না।
          রনির পাশে বসেছিল স্কুলের ‘মিছকি শয়তান’ নামে খ্যাত তন্ময়। তন্ময়ের মত এমন পাজি ছেলে আর একটাও খঁজে পাওয়া যাবে না তাদের স্কুলে। তবে ওর চালাকি খুব সহজে ধরা যায় না। রনিকেও সে খুব জ্বালাতে লাগল। এক সময় দ’ুজনের মধ্যে দ্বন্দ বেধে যায়। তন্ময় জানালার কাছে বসার জন্য জোরাজুরি করতে থাকে। কিন্তু রনি কিছুতেই দেবে না। এক পর্যায়ে দ’ুজনের মধ্যে মারামারি বেধে যায়। মারামারির এক পর্যায়ে হঠাৎ তন্ময় গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে পড়ে যায়। বাসটা আস্তে চলছিল তাই সে বেশি ব্যথা পেল না। তবে ডান হাতটা সামান্য মস্কে গিয়েছে বলে মনে হলো। সাথে সাথে টিচাররা তার প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করে দেয়। তবে এর জন্য পুরো দোষ রনির উপর এসে পড়ে। যদিও সে এর জন্য মোটে ও দায়ী ছিল না। তাই তার আর তন্ময়ের জন্য আজকের পিকনিকটা প্রায় মাটি হয়ে গেল।
    প্রায় দেড়ঘন্টা পর তারা তাদের গন্তব্য স্থানে এসে পৌঁছে যায়। একটু আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো রনি ভুলে যেতে চায় কিন্তু সে পারে না। টিচারদের রাগী রাগী মুখগুলো তার চোখে বার বার ভেসে উঠে। অন্যান্য ছেলেরা কি আনন্দনাই করছে কিন্তু রনি চুপ। রনি একা হেটে বেড়ায়। তাছাড়া তার সাথে কেউ কথাও বলছে না। মাঝে মাঝে দুই-একটা ছেলে তাকে টিট্কারি দিচ্ছে। ঐ দিকে সে ফিরেও তাকায় না। আজকের দিনটা রনি ভেবেছিল বেশ আনন্দে কাটবে কিন্তু তা আর হলো না। তন্ময়ের এক হাতে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে।
    মোটামুটিভাবে তাদের পিকনিকটা শেষ হয়ে গেল। সন্ধ্যার আগেই তারা সবকিছু রেডি করে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। সকাল ছয়টা কি সাতটার দিকে তারা বাড়িতে এসে পৌঁছে যায়।
        হঠাৎ একটা ছেলে দেখতে পায় গাড়ির ছাদে একটা বানর বসে আছে।সে খবরটা সবাইকে জানিয়ে দেয়। তাদেও গ্রামে কোন বানর ছিল না,তাই তারা ভেবেই নিল এটা নিশ্চয় সেখান থেকে এসেছে যেখানে তারা পিকনিক করতে গিয়েছিল। এখন বানরটাকে কী করবে তাই নিয়ে সবার ভিতর প্রশ্ন দেখা দিল। কেউ কেউ বলল,বানরটাকে অন্য গ্রামে ছেড়ে দিয়ে আসতে,নইলে বানরের অত্যাচারে থাকা যাবে না। আবার কেউ কেউ বলল, বানরটাকে যেখান থেকে আনা হয়েছে সেখানে দিয়ে আসতে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিল, কে নিয়ে দিয়ে আসবে? বানরটা গাড়ির ছাদ থেকে নেমে রনির কাঁধে এসে বসে। রনি প্রথমে কিছুটা ভয় পায় কিন্তু পরে তার ভয় কেটে যায়। বানরটার গায়ে সে আলতোভাবে হাত বুলিয়ে দেয়। বানরটার জন্য তার মায়া হতে থাকে। তারপর সে বানরটাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। বাড়ির কেউ প্রথমে বিষয়টা মেনে নেয়নি কিন্তু পরে অনেক জোরাজুরি করে তাদের রাজি করাতে হয়েছিল। তার জন্য অবশ্য রনিকে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়েছে। সে বানর পালে বলে তার সাথে অনেক বন্ধু সম্পর্ক নষ্ট করেছে। সে বানরটাকে বন্ধু করে নিয়েছে তাই তার অন্য বন্ধুর দরকার হয় না।


পাঁচ.    
  
      ররি দিন দিন বেশ বড় হয়ে উঠছে। সেই সাথে তার দুষ্টুমির পরিমাণটাও বাড়ছে। তাই গলায় শিকল দিয়ে বেধে রাখা ছাড়া কোন উপায় নেই। বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে তার ক্ষুধার পরিমাণটাও বাড়ছে। আগের থেকে এখন দ্বিগুন খাওয়া লাগে তার। আর সময় মত খাওয়া না পেলে এমন ভাব করে যেন, আহা! বেচারা কতই না হতভাগা। তার খাওয়ার সময় হলে কিচ্ কিচ্ ডাকতে থাকে। রনি কাছে থাকলে তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। রনির মতো বাড়ির অন্যরাও বানরটাকে কিছুটা আপন করে নিয়েছে। তাই রনি বাড়িতে না থাকলেও তারাই সাধারণত বানরটাকে খাইয়ে থাকে।
    ররির অভ্যাস ও দিন দিন বেশ খারাপ হয়ে উঠছে। সামনে যা কিছু পায় সব মুখে দিয়ে বসে। সাবান থেকে শুরু করে ছাই ও মাঝে মাঝে মুখে দিয়ে খেয়ে বসে।
    ররিকে আজ শিকল দিয়ে বাধা হয়নি। রনিরও কথাটা মনে ছিল না। আজ খোলা পেয়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে বানরটা। রোদ পোহানোর জন্য গিয়ে বসল ঘরের টিনের চালটায়।
    ক্ষেতে ঔষধ দিয়ে রনির বাবা কীটনাশক ঔষধের বোতলটা রেখে দিল বাড়ির উঠানে। ররি ঘরের চালে বসে সে দৃশ্য দেখতে লাগল। যখন রনির বাবা উঠান থেকে চলে গেল ররি তখন চাল থেকে উঠোনে নেমে আসে। সে বোতলটা দেখে ভাবল, নিশ্চয় কোন খাওয়ার জিনিস হবে। তা সে আস্তে বোতলটার মুখ খুলে গপাগপ গিলতে থাকে। তার জানাও ছিল না যে, এটার ভিতর সত্যি কি ছিল! ররির মাথাটা কতক্ষণ ঝিমাতে লাগল। সে বুঝতে ও পারল না তার কি হচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ পর বানরটা ঢুলতে ঢুলতে মারা যায়। মাঝ উঠানেই ররি ঘুমিয়ে পড়ল অতল ঘুমে। ব্যাপারটা এখনো কারও চোখে পড়েনি।
    স্কুলে কেন জানি কিছুতেই রনির মন বসছে না। ররির কথাই বারবার মনে হচ্ছে। ররিকে দেখার জন্য রনি টিফিন টাইমেই বাড়িতে চলে আসে। বাড়িতে এসে রনির মনটা আর ও খারাপ হয়ে যায়। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছে এটা যেন মরা বাড়ি। সে দাদা, বাবা-মাকে জিজ্ঞাসা করে সবাই এত মুখ গোমড়া করে আছে কেন। কিন্তু অবাক কান্ড তারা কেউই তার কথার কোন উত্তর দিচ্ছে না! হঠাৎ রনির দৃষ্টিটা উঠানের দিকে যায়। আস্তে তার হাটা যেন বন্ধ হয়ে যায়। রনি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। রনি তার বুকে একটা ভীষন ব্যাথা অনুভব করল। সে বুঝতে পারল তার বুক ফেটে কান্না আসছে। সে কান্নাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। চোখ দিয়ে অশ্রুধারা আপনিই বয়ে যায়। তার বাবা তাকে স¦ান্তনা দেয়, কাঁদিস না, আমি তোকে আরো ভাল চেয়ে একটা বানর এনে দেব। কিন্তু এসব স¦ান্তনা রনির মনে কোন প্রভাব পেলতে পারে না। তবু ও সে বলে, ররিকে তো আর এনে দিতে পারবে না।
      তার চোখ দিয়ে পানি শুধুই পড়ছেই কোন বন্ধ নেই। গ্রামের অনেক লোক এসেছে বানরটাকে দেখতে। তা দেখে রনির রাগ আরো বেড়ে যায়। সে বলে, ররি মরেছে এখন সবাই তামাশা দেখতে এসেছে যাও সবাই এখান থেকে চলে যাও।
    ররি চলে যাওয়াতে সবার মাঝে কেমন জানি একটা শূন্যতা দেখা দিয়েছে। তার দাদা, স্কুলের টিচাররা ররিকে পছন্দ না করলে ও ররির মৃত্যুতে সবার চোখেই যেন জল এসেছে। আগের মত ররিকে নিয়ে সবার মধ্যে হৈ চৈ কিছুই নেই। ররির কারণে পুরো বাড়িটা যেন নীরব নিস্তব্দ হয়ে গেছে। একটা তুচ্ছ প্রানী ও যে কতকিছু শূন্য করে দিতে পারে এটাই তার প্রমান!

ভূতো কবিগণ

     মানুষের মতো ভূতেদের মধ্যেও ইদানিং কবি প্রতিভার উন্মেষ গঠেছে। তারাও রচনা করছে বিখ্যাত সব ছড়া-কবিতা। আর দেদারমে চলছে তাদের সাহিত্য আসরগুলো। বাঁশাগা কিংবা বটের আগায় বসে সভা-সমাবেশ। হাজার হাজার কাব্যপ্রেমী ভূত সেখানে হাজির হয়। আর বইমেলাগুলো তো পাঠকের আগমনে জমজমাট। এত ভূত আসে যে চলাচলই দায় হয়ে যায়। তাই কর্তৃপক্ষ ভূতদের বইয়ের প্রতি অনুৎসায়িত করেও বইমেলায় তাদের আগমন কমাতে পারেনি। লেখকরাও অবশ্য এত বই পাগল ভূত পছন্দ করে না। তাদের অটোগ্রাফ দিতে সমস্যা হয়ে যায়। অনেক লেখক আবার অটোগ্রাফ বিক্রিও করে। এতে তাদের ভালই ইনকাম হয়।

         ভূতেদের মধ্যে কবিতা লিখে যারা বিখ্যাত হয়েছে তাদের মধ্যে ভূতোখুরি, কবি খেকচরি, কবি সুরসুরি, কবি ভুগচুরি, কবি গড়গড়ি, কবি মাথা পাগলসহ আরো অনেকে। খেকচরি বিখ্যাত হয়েছে তার ‘ভূতেশ্বরী’ নামক কাব্য- গ্রন্থের জন্য। ভূতোখুরি হলো গ্রামের কবি, অনেকটা কবি জসীম উদ্দীনের মতো। গ্রামে বাঁশগাছের সরু আগায় বসে সারাদিন শুধু কবিতা লেখে। ভূতেদের বিজ্ঞানী হরস্কোপের মত সেও মাঝে মাঝে খাওয়া-দাওয়া ভুলে যায়। সে সবার কাছে “বাঁশগার কবি” নামে পরিচিত। নিজেকে নিয়ে একটা কবিতার জন্য সে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। দুই হাজার লাইন বিশিষ্ট এ কবিতার চারটি লাইন তোমাদের জন্য দেওয়া হলোঃ

                   “বাঁশ আগায় বসিয়া লিখিতেছি কাব্য
                    আমি কবি ভূতোখুরি, সৃজি কবিতায় নাব্য
                    আমার কবিতাগুলো বাঁশাগায় থাকবে না পড়ে
                    আমি হব বিখ্যাত অর হয়ে মরে।”

ভূতেদের কবিতা লেখার প্রধান সুবিধা হল তারা সাধু-চলিত ভাষা এক সাথে মিলালেও তাদের গুরুচন্ডালী দোষ হয় না। ভুতো পন্ডিতগন মনে করে যে যেভাবে ইচ্ছা লিখতেই পারে। সকলে বুঝতে পারে এমন জিনিসই তারা ব্যবহার কওে, নিয়ম টিয়মের ধার ধারে না। বর্তমানে ভূতো সমাজে কবিদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে কবি ভুগচুরি। সে বিখ্যাত হয়েছে তার উল্টা-পাল্টা লেখা নিয়ে প্রকাশিত ‘ভালবাসার ভূতক্ষণ’। এ গ্রন্থে সাহিত্যের কিছুনেই বলে অন্যান্য ভূতোকবিরা তাকে কবি উপাধি দিতে নারাজ। কিন্তু বর্তমান ভূত সমাজে তরুনদের উল্টা-পাল্টা জিনিস পছন্দ হওয়ায় তার বইটি জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। তাই উপাধি সে এমনিতেই পেয়ে যায়।

ব্যাঙের ছাতার মতো ভূতো-সমাজে এখানে সেখানে গড়ে উঠেছে নানা পত্রিকার অফিস। তবে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দেশের একটি মাত্র প্রধান পত্রিকা রয়েছে। ভূতো-সমাজে এই পত্রিকার এতই কদর যে, পাঁচ হাজার কোটি সার্কুলেশন হয়েও অনেকে কিনার মত পত্রিকাই পায় না। পত্রিকার নাম হলো ‘ভূতোংলাপ’। সাপ্তাহিক এক লক্ষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত। দেশ-বিদেশ সবখানে এই পত্রিকার কদর আছে। বহু টাকায় রপ্তানী হয় এই পত্রিকা। বর্তমানে সরকারের আয়ের একটা বড় অংশ হলো এই পত্রিকা। এতে সব কবিরা পৃষ্ঠা দখলের চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। একবার কবি খেকচরির লেখা এ পত্রিকায় প্রকাশিত না হওয়ায় চারদিকে তুল-কালাম কান্ড চলে। রাজনৈতিক নেতাদের মতো খেকচরির ভক্তরা পত্রিকা অফিস ঘেরাও গাছপালা ভাঙ্গা ও আগুন জ্বালানোসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। তাই এ পত্রিকার সম্পাদক পেলসককিকে সব সময় সাবধান থাকতে হয় যেন দুর্নীতিবাজ লেখদের লেখা যাতে বাদ না পড়ে। তাদের লেখা ছাপানো আবশ্যক, পরে ভাল লেখকদের লেখা-অবশ্য যদি পৃষ্ঠা বাকি থাকে।

সবচেয় বড় কবিতা লিখে যে বিখ্যাত হয়েছে তার নাম হলো কবি গড়গড়ি। সে পাঁচলক্ষ লাইনের একটা কবিতা লিখে সবার টপে আছে। তারপরে চারলক্ষ নিরানব্বই লাইন বিশিষ্ট একটা কবিতা লিখে দ্বিতীয়তে আছে ভূতোখুরি। কবি গড়গড়ি কবিতা লেখতে শুরু করলে আর যেন শেষ হতে চায় না। তার সবচে কম লাইনের কবিতাটাও দুই লক্ষ তিন লাইন বিশিষ্ট। তাছাড়া ভুতোকবি গড়গড়ি তার এত্তসব বড় বড় কবিতার জন্য অর্জন করেছে ভূতেদের সবচে সেরা পুরষ্কার “ভূতোষ্কার-১০০.৭”।

ভূতোকবিরা যে শান্তিতে ছিল তা কিন্তু নয়। তাদের মধ্যে চলত সব সময় প্রতিযোগিতা। কে কাকে কিভাবে পেছনে ফেলবে তা নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকত। এই যেমন কবি হতে হলে চুল বড় হওয়া চাই-ই-চাই। কিন্তু কার চুল কত বড় তাই ছিল দেখার বিষয়। ভূতেদের মধ্যে সবচে বড় চুল ছিল কবি মাথাপাগলের। কিন্তু তাকে পেছনে ফেলার জন্য খেকচরি মাথাপাগলের চুল থেকে আরো দুই হাত লম্বা আলগা চুল লাগায়।
কারো জনপ্রিয়তা যদি বেড়ে যেত তাহলে ভূতোকবিদের অনেকে কিছু ভূতকে টাকা খাইয়ে  আনত তাদের নিজেদের জনপ্রিয়তা দেখানোর জন্য। এই ছিল ভূতোকবিদের মধ্যকার দ্বন্দ।

ভূতসমাজে বিভিন্ন এলাকায় কবি হওয়ার জন্যও আবার কোঠাপ্রথা চালু ছিল। যেমনটা আছে আমাদের সমাজে। দেশে কবির সংখ্যা কাকের মত বেড়ে যাওয়ায় ভূতো সরকারকে এ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। তাই  বাদ পড়তে হয়েছে অনেক নবীন কবিকে [সাবধান, এ রচনা যেন কোনভাবেই ‘ভূতোসংলাপ’ পত্রিকার সম্পাদ পেলসককির হাতে না যায়। তাহলেই কম্ম সাবাড়। লিখতে হবে তার পত্রিকায়। আমার পক্ষে আবার দুই-তিন হাজার লাইনের কবিতা লেখা অসম্ভব। তাই পাঠকদের গোপনে পড়ার অনুমতিক্রমে লেখক।]



আরো গল্প পড়ুন